Header Ads Widget

header ads

লামা (Lama)

 উপজেলার পটভূমি

বান্দরবান পার্বত্য জেলার অন্যতম উপজেলা লামা। জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেক বাস করে এ উপজেলায়। সুউচ্চ পর্বতমালার চারদিকে নয়নাভিরাম সবুজ শ্যামলিয়া আর নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির সম্মেলনে এ উপজেলাকে দান করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। তবে লামার ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা জানা যায় না। ধারণা করা হয়, ইন্দো মঙ্গোঁলীয় মানব শাখার বংশোদ্ভুত নৃগোষ্ঠিগুলি আমাদের প্রতিবেশী আরকান বা রাখাইন প্রে (বর্তমানে মায়ানমারের একটি প্রদেশ) এবং ত্রিপুরা রাজ্য (বর্তমান ভারতের একটি প্রদেশ) হতে এ পার্বত্য অঞ্চলে সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করে। এ পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে কোন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল না। চাকমা উপজাতীয় লোকজন আরাকানের মারমা জাতীগোষ্ঠী দ্বারা বিতাড়িত হয়ে তাদের রাজাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস শুরম্ন করে। বার্মিজ রাজা বদোপায়া কর্তৃক ১৭৮২ সালে আরাকান আক্রামত্ম হলে মারমারা আরাকান তেকে বিতাড়িত হয়ে পালোংক্ষিসহ বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। তাদের পূর্ণবাসনের জন্য বিট্রিশ সরকার ক্যাপ্টিন হিরাম কক্সকে পারোংক্সিতে পাঠান। এ দুটি দেশ নবম শতাব্দী হতে ষোড়শ শতাব্দী পর্যমত্ম বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপর আধিপত্য বিসত্মারে সক্ষম হয়। এদের অনেকে বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। এরাই বর্তমানে চাকমা ও মার্মা সম্প্রদায় হিসাবে পরিচিত। প্রকৃতি পূজারী এরা পেশায় সবাই পাহাড়ের গাত্রে/ঢালে চাষাবাদে অভ্যসত্ম কৃষক। এ চাষাবাদ পদ্ধতিকে বলা হয় জুম চাষ। এতে সুবিধা অনেক। পাহাড়ের ঢালের চাষাবাদে একসাথে বেশ কয়েকটি ফসলের চাষ করা হয়ে থাকে। যেমন: ধান, তুলা, ঘষ্য, মার্ফা (এক ধরণের শশা) আদা, হলুদ আরও কতক কি শাকসবজি। এ পেশার লোককে বলা হয় জুমিয়া। প্রকৃতি পূজারীদের অনেকেই ইদানিংকালে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এদের মধ্যে টিপরারা অগ্রগামী। এ নৃগোষ্ঠিগুলি কখন কিভাবে লামায় পদার্পণ করেছিল সঠিক করে বলা দুরূহ। ধারণা করা যেতে পারে, ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরার রাজা ধন মানিক্য চট্টগ্রাম দখল পূর্বক চকরিয়া পর্যমত্ম আধিপত্য বিসত্মার করেন। রাজা ধন মানিক্যের নামে কাকারা ইউনিয়নের একটি এলাকার নামকরণ করা হয় মানিকপুর। কালের বিবর্তনে মানিকপুরের অবস্থানরত ত্রিপুরা সম্প্রদায় ক্রমাগতভাবে মাতামুহুরী অববাহিকায় উজান বেয়ে লামা অঞ্চলে প্রবেশ করে স্থায়ী বসবাস আরম্ভ করে। এছাড়া অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী আরকান আলীকদমের সাথে সীমামত্ম যুক্ত, সেদিক হতে জুম চাষ উপযোগী উর্বর পাহাড়ী ভূমির সন্ধানে আলীকদম হয়ে লামায় প্রবেশ করে বসতী (শেকড়) স্থাপন করে। এভাবে লামায় বিভিন্ন জাতি সত্বার সম্মিলন ঘটে। এর পাশাপাশি এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনে বাঙ্গালীরাও পিছিয়ে ছিল না। মাতামুহুরীর নদী পথে ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার কারণে পার্শ্ববর্তী চকরিয়া লোহাগড়া ও সাতকানিয়া এলাকা হতে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেন। এবং বাংলাদেশের নদীভাঙ্গন কবলিত ও বিভিন্ন সমস্যা কারণে বিভিন্ন এলাকা হতে ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীকে এসে পার্বত্য এলাকার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় লামায় বসভাস স্থাপন করেন। ফলে লামা বান্দরবান পার্বত্য জেলার একটি অন্যতম জনবহুল এলাকাতে পরিনত হয়। জানা যায়, ১৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান ‘‘বোমাং’’ রাজার পূর্ব বংশধরের এক নৃপতি আরকান রাজা কর্তৃক চট্টগ্রাম গর্ভণর নিযু্ক্ত হন। ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে মুঘলদের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের কৃতিত্বস্বরূপ আরকান রাজা তাঁকে বোমাং উপাধিতে ভূষিত করেন। বোমাং অর্থ সেনাপতি বা সেনানায়ক। ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবাদার শায়েসত্মা খাঁন ও তার পুত্র বুজুর্গ উমেদ খাঁ এর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দখল করে নিলে বোমাং এবং তার অনুসারীরা আরকানে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৭৭৪ সালে আরকান রাজা কর্তৃক অত্যাচারিত ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে নালিশ জানায় ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে। তখন কোম্পানী পর্যায়ক্রমে তাদের সাম্রাজ্যের বিসত্মার করে যথাক্রমে রামু, ঈদগাহ, চকরিয়া মাতামুহুরী নদীর তীর, মহেশখালী (১৮০৪খ্রি.) পর্যমত্ম। অপরদিকে বোমাং রাজার বংশধরেরা আরও উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বান্দরবানে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। এ সময়ে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ৫১০০বর্গমাইল অঞ্চলকে তিনটি সার্কেলে (মহকুমায়) বিভক্ত করে যথাক্রমে চাকমা, মং ও বোমাং সার্কেল নামকরণ করেন। বর্তমানে বান্দরবান সদর হচ্ছে বোমাং সার্কেল চীফ এর সদর দপ্তর। এ সার্কেলের আয়তন ১৬৬৫ বর্গমাইল এলাকা। বোমাং রাজার নিযুক্ত মৌজার হেডম্যান ও পাড়ার কারবারীর মাধ্যমে ভূমি রাজস্ব আদায় ও জনসাধারণের বিচার আচার সম্পন্ন এবং শামিত্ম-শৃংখলা বজায় রাখা হতো। হেডম্যান কারবারীর ক্ষমতা সীমিত করা হলেও অদ্যাবধি সরকারী প্রশাসনের পাশাপাশি এ প্রথা বিরাজমান।


ভৌগোলিক পরিচিতি

লামা উপজেলা ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে পাহাড় ও নদী বেষ্টিত হওয়ায় দেশের অন্যান্য জেলা উপজেলার চেয়ে পুরোপুরি বৈচিত্র্যময় বলা চলে। উপজেলার দক্ষণে- আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা, পশ্চিমে- কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়া এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা, উত্তরে- বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়ন, পূর্বে- বান্দরবানের থানছি ও রম্নমা উপজেলা।


 


৬৭১.৮৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে নদী এলাকা ৭৮.১৭৩ বর্গ কিলোমিটার, সংরক্ষিত বনভূমি ৩৩২.৮২৭ বর্গ কিলোমিটার ও চাষাবাদযোগ্য ভূমির আয়তন ২৬০.৮৪৫ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে যার অধিকাংশই আবাদ করে গড়ে উঠেছে বসতি। উপজেলাটি ২১.৩৬ হতে ২১.৫৯ উত্তর আংশ এবং ৯২.০৪ হতে ৯২.২৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে ও সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ২৯.৮৭ মিটার উপরে অবস্থিত। এখানকার পাহাড় সমুহের উচ্চতা ২ শ’ থেকে ৩ শ’ মিটার। এক সময়ের দুর্গম পাহাড়ি লামা বর্তমানে কোলাহলপূর্ণ বিকাশমান পর্যটন শহর। এখানের অপরম্নপ প্রাকৃতিক শোভা, বয়ে চলা পাহাড়ী আঁকা-বাঁকা মাতামুহুরী নদী, দুঃখি ও সম্মুখ পাহাড়ের উঁচু চুড়া, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থমান হিসেবে পরিচিত সাবেক বিলছড়ি মহামুনি বৌদ্ধ বিহার ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ইত্যাদি দেশ-বিদেশের ভ্রমন বিলাসী পর্যটকদের সহজে আকৃষ্ট করে। তাছাড়া এ উপজেলায় বসবাসরত নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির রয়েছে আলাদা ভাষা ও সংস্কৃতি। এদের অনেক রীতিনীতি কৃষি, সামাজিক জীবনাচার ও গৌরবময় সাংস্কতিক ঐতিহ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত এবং বৈচিত্র্যময় করেছে।

Post a Comment

0 Comments